খ্রিস্টান বনাম মুসলিম সংলাপ প্রথম পর্ব
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
স্রস্টার প্রতি সৃষ্টির বিনয় প্রকাশের ভাষার আক্ষরিক ও প্রায়োগিক অর্থ:
লেখা:শাইখ আল্লামা কিরানবী (রহঃ) এর বই "ইযহারুল হক (সত্যেরপ্রকাশ)"-বই থেকে সংগৃহীত
\_____________________________/
সর্বশক্তিমান ঈশ্বর মহান আল্লাহ্ সুবহানু ওয়াতা'আলা হলেন আমাদের প্রভু,পালনকর্তা,সৃষ্টিকর্তা/স্রস্টা।সকল সৃষ্টিজগৎ তাঁরই নিপুণতম সৃষ্টি ও তাঁর দ্বারাই প্রতিপালিত। মহান স্রস্টা যখন কোন সৃষ্টিকে সম্বোধন করেন তখন তাঁর সম্বোধনের মধ্যে মালিকসুলভ নির্দেশনা থাকাই স্বাভাবিক।অপরদিকে বান্দা/দাস যখন তাঁর প্রভুকে সম্বোধন করবে বা প্রভুর বিষয়ে কথা বলবে তখন তার মধ্যে চুড়ান্ত বিনয় ও আকুতি থাকতে হবে।নবী/ভাববাদীগণ ছিলেন মহান আল্লাহর অনুগত ন্যায় নিষ্ঠ বান্দা/দাস।কাজেই তাঁদের কথার মধ্যে এই বিনয়,আকুতি,সমর্পণ সবচেয়ে বেশি থাকাই স্বাভাবিক।কাজেই এসকল ক্ষেত্রে সকল বক্তব্যকে শাব্দিক অর্থে গ্রহণ করলে তা নিঃসন্দিগ্ধ ভাবে বিভ্রান্তির জন্ম দিবে।আর বাইবেলের নতুন এবং পুরাতন নিয়মের অগণিত বক্তব্য সেটা প্রমাণ করে।এখানে কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা যাক:
উদাহরণ ১:
King James Bible
And when he was gone forth into the way, there came one running, and kneeled to him, and asked him, Good Master, what shall I do that I may inherit eternal life?
"তিনি যখন পথে চলে গেলেন, তখন একজন দৌড়ে এসে তাঁর [যীশু] কাছে নতজানু হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন,''গুড মাস্টার, আমি কি করব যাতে আমি অনন্ত জীবনের অধিকারী হতে পারি?"(মার্ক ১০:১৭)[KJV BIBLE]
And Jesus said unto him, Why callest thou me good? there is none good but one, that is, God.
যীশু তাকে বললেন,"আমাকে সৎ কেন বলছো?" ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ সৎ নয়।"(মার্ক ১০:১৮) [[KJV BIBLE]
মার্কের ভাষ্যানুযায়ী বক্তব্য এখানেই শেষ।
(এই একই কথা আবার বর্ণনা করা হয়েছে লুকের ১৮:১৮-১৯)
তাহলে এখানে যীশু নিজেই স্বীকার করলেন যে,তিনি সৎ ছিলেন না কেবলমাত্র মহান ঈশ্বর ছাড়া অর্থাৎ তিনি [যীশু] অসৎ/পাপী।
উদাহরণ:২
"ঈশ্বর আমার, ঈশ্বর আমার, কেন তুমি আমাকে পরিত্যাগ করেছ?" আমাকে রক্ষা করা থেকে এবং আমার যন্ত্রণার উক্তি থেকে কেন তুমি দূরে থাক?আমার ঈশ্বর, আমি দিনের বেলা ডাকি, কিন্তু তুমি উত্তর দাও না এবং রাতেও আমি নিরব থাকি না!"(গীতসংহিতা ২২:১-২)
ত্রিত্ববাদী খ্রিস্টান পন্ডিতগণের মতানুসারে এই বক্তব্য হলো যীশুর।তাদের মতে যীশুই এই কথাটা বলেছেন।কারণ যীশু তাঁর তথাকথিত ক্রুশিফিকশনের সময় এরকমই উক্তি ব্যক্তি করেছিলেন যার প্রমাণ দেখুন :-"এল্লাই,এল্লাই,লামা শবাক্তানী। "যার অনুবাদ :প্রভু ...প্রভু!আবার আমায় কেন ত্যাগ করছো?"(মার্ক ১৫:৩৪; মথি ২৭:৪৬)।
উদাহরণ:৩
4. সেইভাবে যোহন হাজির হলেন ও প্রান্তরে বাপ্তিষ্ম দিতে লাগলেন এবং পাপের ক্ষমা,মন পরিবর্তন এবং বাপ্তিষ্মের বিষয় প্রচার করতে লাগলেন।
5. তাতে সব যিহূদিয়া দেশ ও যিরূশালেমে বসবাসকারী সবাই বের হয়ে তাঁর কাছে যেতে লাগল; আর নিজ নিজ পাপ স্বীকার করে যর্দ্দন নদীতে তাঁর মাধ্যমে বাপ্তিষ্ম নিতে লাগলো.........!
9....সেদিনের যীশু গালীলের নাসরৎ শহর থেকে এসে যোহনের কাছে যর্দ্দন নদীতে বাপ্তিষ্ম নিলেন।"(মার্ক ১:৪-৯)
●এখানে আমরা দেখেছি যে,যোহন ব্যপ্টাইজের বাপ্তাইজ ছিল তওবা (মন পরিবর্তন) ও পাপ মোচনের জন্য। আর মার্ক সে কথা ৪ ও ৫ নং ভার্সে সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছেন।
লুক লিখিত সুসমাচারে নিম্নরুপ বর্ণিত হয়েছে:
"তাতে তিনি যর্দ্দনের কাছাকাছি সমস্ত অঞ্চলে গিয়ে পাপের ক্ষমা, মন পরিবর্তন এবং বাপ্তিষ্মের বিষয় প্রচার করতে লাগলেন।"(লুক ৩:৩)
মথি লিখিত সুসমাচারে রয়েছে:
"আমি তোমাদের মন পরিবর্তনের (repentance ;আরবিতে তওবার) নিমিত্তে জলে বাপ্তিষ্ম দিচ্ছি...(মথি ৩:১১)।
প্রেরিতদের কার্যবিবরণের ১৩ অধ্যায়ের ২৪ নং ভার্সে বলা হয়েছে:
"তাঁর আসার আগে যোহন সমস্ত ইস্রায়েল জাতির কাছে মন পরিবর্তনের বাপ্তিষ্মের কথা প্রচার করেছিলেন।"
আবার প্রেরিতদের কার্যবিবরণের ১৯ অধ্যায়ের ৪ নং ভার্সে বলা হয়েছে:-"পৌল বলেলন, যোহন মন পরিবর্তনের (তওবার) বাপ্তিষ্মের বাপ্তাইজিত করতেন....!
এখানে উপরের সবগুলো আয়াতই প্রমাণ করে যে,যোহন বাপ্তাইজের বাপ্তিস্ম ছিল পাপ মোচনের জন্য তওবার বা অনুতাপের বাপ্তিস্ম। আর যীশু এই বাপ্তিস্ম গ্রহণ করেছিলেন বলে স্বীকার করার অর্থ এই যে,যীশু নিজের পাপ স্বীকার করে তওবা ও পাপ মোচনের বাপ্তিস্ম গ্রহণ করেছিলেন।কারণ এছাড়া যোহনের বাপ্তিস্মের মৌলিক আর কোন উদ্দেশ্য ছিল না।
এছাড়া মথির সুসমাচারের ৬ অধ্যায়ে যীশু তাঁর শিষ্যদের যা প্রার্থনা শিক্ষা দিয়েছিলেন তাঁর মধ্যে রয়েছে:-"আর আমাদের অপরাধ সব ক্ষমা কর,যেমন আমরাও নিজের নিজের অপরাধীদেরকে ক্ষমা করেছি;13. আর আমাদেরকে পরীক্ষাতে এনো না,কিন্তু মন্দ থেকে রক্ষা কর।"(মথি ৬:১২-১৩)
একথা সুস্পষ্ট যে,যীশু তাঁর শিষ্যদেরকে যা প্রার্থনা শিক্ষা দিয়েছিলেন,তিনি সে প্রার্থনা নিজেও পালন করতেন।কারণ দ্বিতীয় বিষয়ের আলোচনা থেকে জানতে পারবেন যে,তিনি বেশি বেশি প্রার্থনা করতেন।আর বাইবেলের কোন বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় না যে,তিনি তাঁর শেখানো এই প্রার্থনাটি বাদ দিয়ে অন্য প্রার্থনা করতেন।কাজেই বাহ্যত বোঝা যায় যে:-"আর আমাদের অপরাধ সব ক্ষমা কর"-বলে তিনি বহুবার প্রার্থনা করতেন।অসংখ্যবার তিনি এভাবেই প্রার্থনা করেছেন বলে জানা যায়।
ত্রিত্ববাদী খ্রিস্টানগণ নবী/ভাববাদীগণের জন্য নিষ্পাপ হওয়া শর্ত মনে করেন না।তাদের মতে ভাববাদীগণ পাপ করতে পারেন।তবে তারা যীশুর ক্ষেত্রে নিষ্পাপত্বের দাবি করেন।তারা দাবি করেন যে,মানবীয় ব্যক্তিত্বের দিক থেকেও যীশু নিষ্পাপ ছিলেন।তাদের বিশ্বাস অনুসারে যীশু সৎ ছিলেন,ঈশ্বরের নিকট গ্রহণযোগ্য ছিলেন,ঈশ্বর কতৃক পরিত্যক্ত ছিলেন না। কিন্তু আমরা দেখেছি যে,যীশু বলেছেন:
১)আমাকে কেন সৎ বলিতেছ ...?
২)ঈশ্বর আমার,ঈশ্বর আমার,তুমি কেন পরিত্যাগ করলে...?
৩)আমাকে রক্ষা করা থেকে এবং আমার যন্ত্রণার উক্তি থেকে কেন তুমি দূরে থাক?
৪)আমি দিনের বেলা ডাকি, কিন্তু তুমি উত্তর দাও না।
৫)যোহনের কাছে পাপ স্বীকার করে পাপ মোচন ও তওবার নিমিত্তে বাপ্তিস্ম গ্রহণ।
৬)আমাদের অপরাধ সকল ক্ষমা করো।
(নোট:এছাড়া ধর্মের বা জন্মের কারণে পরজাতির মানুষদের কুকুর বলা,অকারণে সম্পূর্ণ নিরাপরাধ একটি বৃক্ষকে অভিশাপ দিয়ে মেরে ফেলা,ক্রোধান্বিত হয়ে মানুষকে শয়তান বলা যা অনুরূপ গালি দেওয়া ইত্যাদি
এখন ত্রিত্ববাদী খ্রিস্টানগণ অবশ্যই স্বীকার করতে বাধ্য যে,যীশুর এসকল বক্তব্যের আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করা যায় না বরং এগুলোকে বিনয় ও দাসত্বের প্রকাশ হিসেবে ধরতে হবে। তারা যদি এসকল বক্তব্যের আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করেন তবে তাদের কে অবশ্যই স্বীকার করতে বাধ্য যে যীশু প্রকৃতপক্ষেই পাপী/অসৎ ছিলেন,তিনি ঈশ্বরের পরিত্যক্ত ছিলেন,তিনি মুক্তি থেকে দূরে ছিলেন,ঈশ্বর তাঁর ডাকে সাড়া দিতেন না বা তাঁর প্রার্থনা কবুল করতেন না ,তিনি পাপী ছিলেন। তারা [খ্রিস্টানরা] যেহেতু স্বীকার করবেন না,সেহেতু তারা বলতে বাধ্য হবেন যীশুর মানবীয় সত্তা ঈশ্বরের প্রতি দাসত্বের প্রকাশ ,আকুতি ও বিনয় হিসেবে এসকল কথা বলেছেন।
গীতসংহিতাতে বলা হয়েছে:
2. "ঈশ্বর স্বর্গ থেকে মানবজাতির সন্তানদের প্রতি দেখলেন কেউ আছে কি না যে বুঝতে পারে ও যারা তাঁর খোঁজ করে।3. সবাই বিপথে গেছে, সবাই নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে; ভালো কাজ করে এমন কেউ নেই, একজনও নেই "(গীতসংহিতা ৫৩:২-৩)।
যিশাইয় পুস্তকে বলা হয়েছে:
9. "এজন্য ন্যায়বিচার আমাদের থেকে দূরে থাকে আর ধার্মিকতা আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারে না। আমরা আলোর জন্য অপেক্ষা করে থাকি, কিন্তু অন্ধকার দেখতে পাই; আমরা আলোর খোঁজ করি, কিন্তু অন্ধকারে চলি......!
12....... কারণ আমাদের অনেক অন্যায় তোমার সামনে আছে এবং আমাদের পাপ আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। কারণ আমাদের পাপ আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই রয়েছে এবং আমরা আমাদের পাপ জানি।
13. আমরা বিদ্রোহ করেছি, সদাপ্রভুকে অস্বীকার করেছি এবং আমাদের ঈশ্বরকে অনুসরণ করার থেকে দূরে সরে গিয়েছি৷ আমরা অত্যাচার ও বিপথে যাওয়ার কথা বলেছি, অভিযোগ এবং মিথ্যা কথা হৃদয়ে ধারণ করেছি।"(যিশাইয় ৫৯:৯-১৩)
এছাড়া যিশাইয়ের অন্যত্রে বলা হয়েছে:
6 "আমরা প্রত্যেকে অশুচি ব্যক্তির মত হয়েছি আর আমাদের সমস্ত ভালো কাজ নোংরা কাপড়ের মত। আমরা সবাই পাতার মত শুকিয়ে গিয়েছি; আমাদের পাপ বাতাসের মত করে আমাদের উড়িয়ে নিয়ে গেছে।
7. কেউ আর তোমার নামে ডাকে না, তোমাকে ধরতে কেউ চেষ্টা করে না; কারণ তুমি আমাদের থেকে তোমার মুখ লুকিয়ে রেখেছ এবং আমাদের পাপের কাছে সমর্পণ করেছ।"(যিশাইয় ৬৪:৬-৭)
নিশ্চয়ই দাউয়ুদের যুগে অনেক সৎ ও ধার্মিক ব্যক্তি বিদ্যমান ছিলেন।নাথন ভাববাদী তাদের একজন। ত্রিত্ববাদী খ্রিস্টানদের মতে ভাববাদীগণের জন্য নিষ্পাপ হওয়া জরুরী নয়।তাদের এই বিশ্বাস অনুসারে মনে করা হয় যে,নাথন ভাববাদীও নিষ্পাপ ছিলেন না ,তবুও তো অন্তত ৫৩ গীতসংহিতা ৩ নং আয়াতের আক্ষরিক অর্থ তাঁর ও তাঁর মত ধার্মিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না।
যিশাইয় ভাববাদীর বক্তব্যে প্রথম পুরুষের সর্বনাম ব্যবহার করা হয়েছে।অর্থাৎ যিশাইয় ভাববাদী নিজের এবং অন্যান্য মানুষদের কথা এখানে বলেছেন।আমরা জানি যে,যিশাইয় ভাববাদী ,তাঁর যুগের অন্যান্য ভাববাদী এবং অন্যান্য অনেক সৎ ও ধার্মিক লোক সে সময়ে বিদ্যমান ছিলেন।তারা নিষ্পাপ না হলেও অন্তত একথা স্বীকৃত/নিশ্চিত যে,যিশাইয় ভাববাদীর উপযুক্ত বক্তব্যদ্বয়ের আক্ষরিক অর্থ তাঁদের উপর প্রয়োগ করা যায় না। কাজেই গীতসংহিতার উপযুক্ত বক্তব্য এবং যিশাইয় ভাববাদীর উপযুক্ত বক্তব্যদ্বয় কখনোই বাহ্যিক ও আক্ষরিক অর্থে সত্য হতে পারে না।বা আক্ষরিক ও বাহ্যিক অর্থে সেগুলিকে দাউদ,নাথন,যিশাইয় ও অন্যান্য ভাববাদীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না।বরং একথা অবশ্যই মানতে হবে যে,বান্দার আকুতি,স্রস্টার প্রতি অত্যন্ত বিনয় এবং অসহায়ত্ব ,দাসত্ব প্রকাশ করা এসকল বাক্যের উদ্দেশ্য।
দানিয়েল পুস্তকের ৯ অধ্যায়ে,যিরমিয়ের বিলাপের ৩ ও ৫ অধ্যায়ে,এবং ১ম পিতরের ৪র্থ অধ্যায়ে অনুরূপ বক্তব্য দেখা যায়।

0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home